বই পড়া


আমি নেশাগ্রস্থ মানুষ। আমার নেশার বস্তু হচ্ছে বই, একটা বই পড়তে শুরু করলে সেটা শেষ করার পূর্ব পর্যন্ত আমার খাওয়া ঘুম বরবাদ।
সেইযে প্রথম মায়ের কাছে রুপকথার গল্প শুনেছি তখন থেকেই বইয়ের প্রতি আকর্ষণ অদম্য। তবে সেটা পাঠ্যপুস্তক নয়, অবশ্যই গল্পের বই। সামনে যাই পেতাম গিলতাম গোগ্রাসে। ইসলামীক গল্পের বইয়ের সন্ধান পেয়েছিলাম সর্বপ্রথম জালালউদ্দীন রুমীর ‘মসনবী’র মাধ্যমে, তারও আগে হযরত বায়েজীদ বোস্তামীর মাতৃভক্তির গল্প শুনেছিলাম মায়ের কাছে।
আমার কাছে মাতৃভক্তির সংজ্ঞা ছিলো অন্যরকম, মায়ের কোলে উঠে মাথার চুল টানা আর উপর্যুপরি গালি, কিল, ঘুশি এবং পাগলামী।
তবে বায়েজিদ বোস্তামীর গল্প শুনে মনে মনে একটা সুপ্ত বাসনা কাজ করছিলো, “ইস! আমার মায়ের যদি এমন অসুখ হয়, তাহলে আমিও পানি নিয়ে মায়ের পাশে দাড়িয়ে থাকবো!”
মায়ের একদিন সত্যি সত্যি খুব অসুখ হয়েছিলো, তবে পানি নিয়ে দাড়িয়ে থাকার সৌভাগ্য হয়নাই।

রুপ কথার দৈত্য দানবের গল্প পড়তে পড়তে যখন সব মুখস্ত করে ফেলেছি, তখনই হাতে পেলাম ‘কিশোর তারোকালোক’ প্রতিটা পাতা পড়ি আর শিহরিত হই, “ইস! কত ছোট ছোট পিচ্চিগুলো টিভিতে মডেলিং করে, নাটক করে, আর আমি হাবা-গোবার মতো ঘরে বসে আছি!” নিজের বয়সের সাথে মডেলদের বয়সের পার্থক্য মিলিয়ে নিতাম, মনে মনে স্বপ্ন দেখতাম, একদিন আমিও মডেল হবো, শাওন, ঈসিতা, মীমদের মতো পিচ্চি পিচ্চি মডেলদের সাথে নাটক করবো!

একদিন হাতে পেলাম “কিশোর কন্ঠ”! সাহিত্যের এক অন্য দিগন্তের সন্ধান পেলাম। কিশোর কন্ঠ পড়ে আর মডেল হতে ইচ্ছে হলোনা, কেবলই মনে হচ্ছিলো, পাহাড়ি এক লড়াকু গল্পের নায়কের মতো এক মুজাহীদ হবো। কিংবা ‘সাহসী মানুষের গল্পে’র মতো সাহসী মানুষ হবো। ঈমানদিপ্ত মুসলিম হবো।

হাইস্কুল লেভেলে আমাকে আর পায় কে, বই বই আর বই! মিউনিসিপ্যাল স্কুলে ভর্তি হলাম, স্কুলের পাশেই নূপুর মার্কেটে পুরাতন বইয়ের দোকান। ক্লাস সিক্সে পড়ুয়া সেই পিচ্চি ছেলেটা নূপুর মার্কেটের বই কিনতে কিনতে দোকানদের পরিচিত মুখ হয়ে গেলো। প্রতিদিন একটা করে বই কিনতেই হবে, না কিনলে মানসিকভাবে অশান্তিতে ভুগতাম। কি যেনো, হয় নাই, হয় নাই, মনে হতো।

তিনগোয়েন্দা, মাসুদ রানা, কুয়াশা, ওয়েস্টার্ণ, কিশোর ক্লাসিক, হুমায়ুন, ইমদাদুল হক মিলন। বাকি আছে কিছু?! সবই কিনেছি।
সেঝ কাকা চট্টগ্রামে বেড়াতে এলেন, ঘর ভর্তি বইয়ের স্তুপ দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “এতো গুলো বই যে কিনলি, কয়দিনে পড়বি?”
কিছুটা গর্বিত ভাবেই বললাম, ‘কাকা সবগুলো পড়ে ফেলেছি’।
কাকার চোখে অবিশ্বাসের হাসি, “থাক আর মিথ্যে বলতে হবেনা!”

এরিখ মারিয়া রোমার্ক, জুল ভার্ণ, এইচ জি ওয়েলস, ব্রাম স্টোকার, মারিয়া পুজো, হ্যাগার্ড, মার্ক টোয়েন থেকে শুরু করে বিশ্ব বিখ্যাত লেখকদের দারুণ সব বই আমার পড়ার তৃষ্ণা দিন দিন বাড়িয়েই দিচ্ছিলো।

তবে সবচাইতে মজার যে ব্যাপার সেটা হচ্ছে, এতো এতো বই পড়েছি সে তুলনায় আমি যে আদর্শের পতাকা বাহক হতে চাই সে আদর্শের বই নেই বললেই চলে।
একটা ছেলেকে সারাদিন কোরান হাদিসের বানী শুনিয়ে দেয়ার পরে সে মনের খোড়াক নিবে ওয়েস্টার্ণ পুঁজিবাদী কিংবা সমাজবাদী লেখদের ক্লাসিক্যাল উপন্যাস হতে।
আমিও সেটাই করেছি, সমাজবাদী লেখকদের বই পড়েছি, ক্লাসের বন্ধুদের পাল্লায় পরে ছাত্র ইউনিয়নের অফিসে গিয়েছি, ঘন্টার পরে ঘণ্টা আড্ডা দিয়েছি। তবে আমার উপর আল্লাহর বিশেষ রহমত ছিলো বলেই সম্ভবত গোল্লায় যাইনি। অথচ গোল্লায় যাওয়াটাই স্বাভাবিক ছিলো।
এক মৌলিক লেখা ‘সাইমুম’ আর অনুবাদ সাহিত্য ‘ক্রুসেড’ সিরিজ ছাড়া আমাদের আর কি আছে? শুধু রাজনীতি করলেই ইসলামী বিপ্লব হবেনা, বিপ্লব হতে হবে সমাজ,সাহিত্য,শিক্ষা, মিডিয়া, সামরিক,বেসামরিক প্রতিটা সেক্টরে। আমরা শুধু রাজনীতিই করছি, অন্যদিকগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে বাতিল মতাদর্শের অনুসারীরা।

এতো এতো সাহিত্যের ভিড়ে শিবিরের সিলেবাসের বাইরে ইসলামী সাহিত্য পড়ার অবকাশ খুব একটা হয়ে ওঠেনি। এটার পেছনে অবশ্য যুক্তিসংগত কারণও ছিলো, সেটা হচ্ছে ইসলামী সাহিত্যগুলো রচিত হয় নিরামিষ টাইপের ভাষায়। উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে সীরাতে ইবনে হিশাম পড়েছিলাম সম্ভবত নবম শ্রেনীতে, ক্যারেন আমস্ট্রং এর ‘ইসলাম’ বইটি পড়েছিলাম ইন্টারে।
সাঈয়েদ কুতুবের ‘কালজয়ী আদর্শ ইসলাম’ বইটি হাইস্কুলেই পড়েছিলাম, কি বুঝেছি কি বুঝিনাই সেটা এখন আর মনে করতে পারছিনা।

ইসলামী সাহিত্য অধ্যায়নের এই ঘাটতি পূরনের স্বার্থেই তাফহীমূল কুরআনের পুরো সেট কিনে ফেললাম। ধার করা বই পড়ে তৃপ্তি পাইনা, সিরাতে ইবনে হিশাম হারিয়ে ফেলেছিলাম সেটাও পুণরায় কিনলাম। সেও বহু আগের কথা, তারপরে দিন গড়িয়েছে অনেক, দীর্ঘদিন হলো ইসলামী বই কেনা হয়না।

আজকে আন্দরকিল্লা গিয়েছিলাম, উদ্দেশ্য ছিলো কারাগারের দিনগুলো বইয়ের খোঁজ খবর নেয়া। আজাদ বুকসের স্তুপ করা লোভনীয় সব বইয়ের সমাহার দেখে বই কেনার সেই পুরানো নেশাটা মাথাচারা দিয়ে উঠলো। পকেটে ছিলো পর্যাপ্ত টাকা এবং মনে ছিলো পর্যাপ্ত আকাঙ্খা, আলহামদুলিল্লাহ।
একে একে কিনে ফেললাম, ইমাম নববী (রহঃ) এর ‘রিয়াদুস সালেহীন’ (সব খন্ড একত্রে), মাওলানা মওদূদী (রঃ) এর ‘ইসলামী সংস্কৃতির মর্মকথা’, মাওলানা আব্দুর রহীমের ‘সুন্নাত ও বিদয়াত’, এবং ‘ইসলামে হালাল-হারামের বিধান’। রসূলুল্লাহ (সঃ) এর জীবনীগ্রন্থ ‘আর রাহীকুম মাখতূম’ এবং মূফতী শাফী (রঃ) এর তাফসীর গ্রন্থ ‘তাফসীর মা’রেফুল কুরআন’।
চকচকে আর্ট পেপারে প্রিন্ট করা তাফসীরে মা’রেফুল কুরআন বইটি ছিলো আমার কারা জীবনের সঙ্গী, বইটিকে আজ আপন করে নিলাম।
আশা করছি, আগামী কিছুদিন বইগুলো নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাতে পারবো।

লেখাঃ বই পড়া
© শামীম রেজা
২৭/০৫/২০১৪

Post Comment

No comments:

Post a Comment